⭐ রেটিং: ৪.৫/৫.০


🌱 পর্যালোচনা

ঋত্বিক ঘটক- বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য কিংবদন্তি। সমস্তজীবন জুড়ে প্রচারবিমুখ, ডার্টব্যাক এই মানুষটার সাথে তুলনা করা যায় না কাউকেই। দুনিয়াজোড়া খ্যাতির শিখরে পৌঁছানো সত্যজিৎ রায়কেও ঋত্বিক ঘটকের সামনে নেহাৎ মাঝারিই মনে হয়। রাশিয়ার তারাকোভস্কির মত তিনিও হাতে গোনা কয়েকটি ছবির সূত্র ধরে হয়ে উঠেছেন আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বিকার অংশ।

ঋত্বিকের ছবির পুরোটাই ছিলো গোটা দুনিয়ার মানুষের সংগ্রামকে বাংলা ভাষার চিত্রে ছোট জীবনের ক্যানভাসে তুলে ধরা। তার চরিত্রসমূহের লড়াই যেন সমগ্র দুনিয়ার নিপিড়ীত মানুষের মহোত্তম সংগ্রাম। তিনি বিশ্বাস করতেন নির্যাতিত-নিপিড়ীত মানুষের জীবনকে ক্যানভাসে তুলে ধরার জন্য চাই কাছ থেকে তাদের জীবনকে অনুধাবন করা। তাই তিনি ঘুরর বেড়িয়েছেন বস্তিতে বস্তিতে, ভাত খেয়েছেন নদীর মাঝি মল্লাদের সাথে। তবুও যেন নিজেকে যথাযথ প্রকাশ করতে পারার বেদনায় ছটফট করছেন নিজের ভেতরে। তিনি সবসময় বলতেন- “দুইটি আপাত সম্পর্কহীন শট একটি তৃতীয় অর্থ আমাদের সামনে উপস্থাপন করবে যা ছবির আখ্যানভাগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এখানেই ডায়লেকটিস। থিসিস, এন্টিথিসিস এবং সিনথেসিস। মার্কসের এপ্রোচ টু রিয়েলিটিতে আমরা পৌঁছাতে পারব”। বঞ্চিতদের কথা ছবিতে তুলে ধরেও যেন সবটুকু বলা হলো না এই আক্ষেপে ভুগেছেন এক্সেনট্রিসিজমে, পাগলাটে অপ্রকৃতস্থতায়। তারই প্রমাণ মেলে বিমানবন্দরে ইজরায়েলিদের মারতে এগিয়ে যাওয়া, সমাজপতিদের চাটুকারিতার জন্য সত্যজিৎ, মৃণাল সেনের মত পরিচালকদের অকথ্য সমালোচনা করা, বাংলা মদ আর সুতোর বিড়ি-তে। আর এসবকিছুই নিবিড় পর্যবেক্ষনে লেখক তুলে এনেছেন তার বইয়ে।

মানুষকে পাগলের মত ভালোবাসতেন ঋত্বিক ঘটক। শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য সম্পাদিত এক সাক্ষাৎকরে ঋত্বিক বলেছিলেন- “মানুষকে আমি ভালোবাসি পাগলের মত। মানুষের জন্যই সবকিছু। মানুষই শেষ কথা। সব শিল্পেরই শেষ পর্যায়ে মানুষ”। সে কারণেই হয়ত মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছেন অপরিমেয়। স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন তার একনিষ্ঠ অনুরাগী। এছাড়া বম্বে, পুনের চলচ্চিত্র মহলের অনেকেই ছিলো তার ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী। এমনকি সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সকলেই তার প্রশংসা করে গেছেন নির্বিকারভাবে। ঋত্বিক সিনেমাকে বেছে নিয়েছিলেন শোষিত মানুষের কথা বলার জন্যই। তার উদ্দেশ্যই ছিলো সিনেমার মাধ্যমে মানুষের কাছে যাওয়া। তারই কথা বলতে গিয়ে বলেছেন- “কালকে বা দশ বছর পরে যদি ভালো কোন মিডিয়াম বেরোয় আর দশবছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি তবে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাবো। সিনেমার প্রেমে আমি মশায় পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম”। নিজের সিনেমাকে বিচার করতে বলেন- “আমি কোন সময়েই একটা সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না- একটি ছেলে ও একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে, প্রথমে মিলতে পারছে না, তাই দুঃখ পাচ্ছে, পরে মিলে গেল বা একজন পটল তুলল। এরকম বস্তাপচা সাজানো গল্প লিখে বা ছবি করে নির্বোধ দর্শকদের খুব হাসিয়ে বা কাঁদিয়ে ঐ গল্পের মধ্যে ইনভলব করিয়ে দিলাম, দু মিনিটেই তারা ছবির কথা ভুলে গেল, খুব খুশি হয়ে বাড়ি গিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এর মধ্যে আমি নেই। আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো ইট ইজ নট অ্যান ইমাজিনারি স্টোরি, বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হ্যামার করে বোঝাবো যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যেটা বুঝাতে চাইছি সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্যই আমি আপনাকে অ্যালিয়েন্ট করব প্রতি মুহূর্তে”।

লেখক মিহির মৈত্র ছিলেন বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাসের চাকুরীজীবি। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ করতে ঋত্বিক ঘটক এলেন ঢাকায়। সেই থেকে মিহির মৈত্রের দৈনন্দিন কাজ হয়ে উঠলো সন্ধ্যায় ঋত্বিক ঘটকের গ্রীন হোটেলে গিয়ে আড্ডা জমানো আর আড্ডা শেষে বাসায় ফিরে সেগুলোকে ডায়েরীতে টুকে রাখা। সেই টুকে রাখা গল্পগুলোই তার অনবদ্য সৃষ্টি ‘পরিচালক ঋত্বিক ঘটক”। মিহির মৈত্র নিজেও চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত ছিলেন। ‘সুবর্ণরেখা’ প্রদশর্নের পর সাফল্য ও সদ্য স্বাধীন ঢাকা তথা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবন তার এই বইয়ে ফুটে উঠেছে। যেমন ক্যান্টনমেন্টে ঋত্বিকের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও বঙ্গবন্ধু হত্যার ভবিষ্যৎবাণী।

বইটির মুখবন্ধ লিখতে গিয়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় জীবনান্দ দাশের কবিতার একটি লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে যথার্থই বলেছেন -“এখন অপর আলো পৃথিবীতে জ্বলে”। সিনেমা যদি আলোর শিল্প হয়, ঋত্বিকের নির্মানে তবে এই ‘অপর আলো’-র কারুকাজ রয়েছে। আবার জীবনানন্দ দাশের পরিনতির সাথেও ঋত্বিক ঘটককের পরিণতি মিলে যায়। তাদের কাউকেই তৎকালীন মানুষ বুঝতে পারেনি। কারণ তারা দুইজনেই ছিলেন সেই সময় থেকে বহু এগিয়ে। সেটা ঋত্বিক ঘটক নিজেও বুঝতে পারছিলেন। দৈন্য, দুঃখে সংসারকে কিছুই দিতে না পেরে স্ত্রীকে বলেছিলেন – “লক্ষী, টাকা পয়সা একদিন থাকবে না। কাজটা থেকে যাবে”। ঠিকই তিনি রয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে।

‘আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও ঋত্বিক’ অধ্যায়ে লেখক যেমনি ঋত্বিক ঘটকের জ্ঞান ও বিশ্লেষণধর্মী চতিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি ‘সৃজনশীল ঋত্বিক’ অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন সিনেমার বিভিন্ন উপাদান যেমন- কথা ও সংলাপ, সংগীত, ইন্সিডেন্টাল নয়েজ, ইফেক্ট নয়েজ প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানবোধ। অন্যান্য অধ্যায়গুলোর ক্ষেত্রেও ঐ একই বক্তব্য। সবমিলিয়ে নিজের চেনা ঋত্বিক ঘটককে সামনে নিয়ে এসেছেন।

ঋত্বিকের জীবনের এমন অনেক ঘটনার সমষ্টিতে সৃষ্ট বইটি একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী হিসেবে বরণ করেই নিতে হয়। মানুষ ঋত্বিককে জানার জন্য, যারা ঋত্বিক চর্চায় নিয়োজিত আছে তাদের জন্য বইটি মূল্যবানই বলা চলে। যদিও লেখক কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবেগ ও অতিশয়োক্তিক বশবর্তী হয়েছেন, তবে সেটা নিতান্তই নিবিড় অনুরাগী হিসেবে। বরং লেখকের এই আন্তরিকতাকে অভিনন্দনই জানাতে হয়।